সর্ষের মধ্যে ভূত ২য় পর্ব

একথা ওকথাতে প্রায় আধাঘন্টা কেটে গেল। এবার বাড়ী যাবার কথা মনে হল। অফিসের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে আর ভালো লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল ছুটির দিনটা মিস করলাম। মনিদাকে বিদায় জানিয়ে বাড়ীর দিকে এগোলাম।

এসে বেল বাজালাম। কেউ এসে দরজা খুলল না। আবার বেল বাজালাম। তিন চারবার বাজিয়ে সাড়া না পেয়ে এবার চাবি বের করে সরাসরি গেট খুল্লাম।
সুস্মিতা দেরী করলে ‘আসছি’ বলে সাড়া দেয়। অবাক হলাম। ছাদে গিয়ে ও ঘর এ ঘর দেখি সুস্মিতা নেই।
তবে সুস্মিতা কি বুলুপিসির ঘর থেকে এখনো ফেরেনি।

রহস্যময় লাগলো। নিজেকে কেমন ফেলু মিত্তির গোছের মনে হল। যে নিজের স্ত্রীর এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার নিয়ে তদন্ত করছে।

বেশ গরম লাগছিল ফ্যানটা চালিয়ে কিছুক্ষণ হাওয়া খেলাম। বেডরুম থেকে বের হয়ে আবার নিচে জঞ্জাল রাখা ঘরে গেলাম।
আরো আধা ঘন্টা প্রবল উৎকণ্ঠায় কেটে গেল। সুস্মিতা বুলুপিসির বাড়ী থেকে এসে পেছন দরজাটা খুলল।

সুস্মিতার পরনে সেই কমলা নাইটিটা। গলাও কপাল ঘামে চপচপ করছে। ফর্সা গলায় ঘামে সোনার চেনটা ঘুরে পেছন দিকে ঝুলছে। খোঁপা করে চুল বেঁধে রাখলেও কিছু চুল সামনে কপালে এসে পড়েছে।
চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ।
সুস্মিতার এমন বিধস্ত চেহারা দেখে অবাক হলাম। সুস্মিতা সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই সেই বিদঘুটে ঘামের গন্ধটা নাকে এলো। তীব্র পুরুষালি ঘামের গন্ধ।
সুস্মিতা ছাদে যেতেই আমি বেরিয়ে এলাম। বুঝতে বাকি রইলো না আমি যা এতদিন দুনিয়া খুঁজে ফিরছি, তা আসলে এই বাড়ীর ক্যাম্পাসেই। অর্থাৎ বুলু পিসির বাড়ীতেই সুস্মিতার যৌনসঙ্গী রয়েছে। সর্ষের মধ্যেই যে ভুত রয়েছে তা পরিষ্কার হল। কিন্তু বুলু পিসি তো একাই থাকে। তবে? কতদিন ধরে চলছে সুস্মিতার এই প্রেম?
সবচেয়ে বড় কথা এই বিদঘুটে ঘামের গন্ধ কোনো ভদ্রলোকের হতে পারে না। মনে হয় যেন লোকটা স্নান করে না নাকি? কি নোংরা জমানো ঘামের গন্ধ। সুস্মিতার মত পরিছন্ন মেয়ে কি করে সহ্য করে? শরীর সুখে সবই বোধ হয় সম্ভব।

ভেবেছিলাম আজই রহস্য উদঘাটন করে ফেলবো। কিন্তু উল্টে আজ আরো রহস্য জটিল হয়ে গেল। কে আসে বুলু পিসির বাড়ীতে? বুলু পিসি কি জানেনা?
সুস্মিতার মুখে শুনেছিলাম বৃদ্ধা শয্যাশায়ী ।

একটু দেরী করে বাড়ী ফিরলাম। সুস্মিতা অর্ঘ্যকে পড়াতে বসেছে। আমি স্নান সেরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম সুস্মিতা চা রেডি করে রেখেছে।
সুস্মিতা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল- সমু আজ রাতে কি করবো?
আমি সুস্মিতার দিকে চেয়ে থাকলাম। আমার অমন সুন্দরী, পতিব্রতা স্ত্রী এত ডেসপারেটলি কাজ করতে পারে ভাবা যায় না।
সুস্মিতার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকত্ব পেলাম না। এরকম সুস্মিতাকেই তো আমি গত আট বছর ধরে দেখে আসছি।
মনে মনে ভাবলাম সুস্মিতা যদি অনেকদিন ধরে এই অবৈধ সম্পর্ক রেখে থাকে, তাহলেও আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

সুস্মিতার কথায় টনক নড়লো-
সমু কি হল বললে না যে?

—যা হোক রান্না করে ফেল।
এটুকু বলেই উঠে পড়লাম।

সেই রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। সুস্মিতা পাশে শুয়ে আছে। নাকের কাছে যেন সেই বিকট ঘামের গন্ধটা লেগে আছে। পরক্ষনেই বুঝলাম এটা মনের ভুল। সুস্মিতার গায়ে সেই মিষ্টি গন্ধটা আগের মতই আছে।

সুস্মিতা ঘুমিয়ে গেছে। কিছুতেই ঘুমোতে পারছি না। সিগারেট ধরিয়ে ছাদে গেলাম। খোলা ছাদ থেকে চারপাশটা দেখা যায় বেশ।
বুলু পিসির বাড়ীর টালি আর সামান্য এজবেস্টেস দেওয়া ছাদের উপরে একটা বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িটা পুরো অন্ধকার। পয়সা না দিতে পারায় ইলেক্ট্রিকের লাইন কেটে দিয়ে গেছে অনেকদিন হল।
সত্যি কি করে একটা বুড়ি মহিলা একা থাকে। তার ওপরে এখন আবার বিছানাশায়ী। বুলুপিসির বাড়ীর মধ্যে কখনো যাইনি। সুস্মিতাই যায়।
যে ইঁটের ভাঙাচোরা বাড়িটাকে প্রতিদিন দেখেও কিছু মনে হয়নি, সেই বাড়িটাকে আজ রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
রহস্য উদ্ধারের নেশা চেপে বসলো। সিগারেটটা নিভিয়ে একটা টর্চ লাইট নিলাম। সুস্মিতাকে গিয়ে দেখলাম ঘুমোচ্ছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। সন্তর্পনে পেছন দরজা খুলে বেরিয়ে গেলাম।
বুলুপিসির বাড়ীর চারদিকটাই ঝোপে ভর্তি। পুরোনো একটা কাঠের ভাঙা দরজা সেটা ভেতর থেকে লাগানো।

বাড়িটার পেছন দিকে গিয়ে দেখলাম এক জায়গায় কিছু কাঠের পাটা গুদাম করা আছে। পেছন দিকটা খোলা উন্মুক্ত দুয়ার।
বুঝতে পারলাম এই দিক দিয়েও ভেতরে যাওয়া যাবে। কিন্তু এই কাঠের জমা আবর্জনা, ঝোপ পেরিয়ে সাপখোপের বিপদ রয়েছে।

সাহস করে ধীরে ধীরে টর্চের আলো ফেলে ঢুকলাম। ভেতরে ঢুকে দেখলাম একটা ঘরে ল্যাম্প জ্বলছে। সেই ঘরে খাট পাতা। খাটে বুলু পিসি ঘুমোচ্ছে। পাশেই টিউবয়েল আর টিনের দরজার বাথরুম।

বুঝলাম আর একটা ঘর আছে। কিন্তু দরজাটা কোথায়?
একটু ঘুরতেই একটা বন্ধ দরজা নজর পড়লো। দরজাটা বাইর থেকে তালা দিয়ে বন্ধ করা।
হঠাৎ মনে হল আশেপাশে কেউ জেগে আছে। খুব মৃদু ভাবে টুং টাং শব্দ আসছে কোথা থেকে!
চমকে উঠলাম। শব্দটা ঘরের ভিতর থেকে। কিন্তু বাইর থেকে তো তালা দেওয়া। ভেতরে কে বেড়াল নয়তো? বেড়াল হলে ভেতরে ঢুকবে কেমন করে? ইঁদুর হতে পারে।
আমি এগোতে যাবো- এবার বেশ জোরেই শব্দ পেলাম। পরিষ্কার বুঝতে পারছি মানুষের শব্দ- নতুবা কোনো পোষা প্রাণী রাখা আছে।
বন্ধ দরজার ভেতরে মানুষই বা থাকবে কেন?
*****

ভোরে ঘুম ভাঙলো। দেখলাম সুস্মিতা পাশে নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তখন সবে ভোর চারটা।
বাথরুমে জল ছাড়ার শব্দে বুঝতে পারলাম সুস্মিতা বাথরুমে গেছে। ঘুম ধরে গেল।

এক ঘন্টা পর দড়াম করে ঘুম ভাঙলো। সুস্মিতা পাশে নেই। উঠে বসলাম। নাঃ সুস্মিতা বাথরুমে স্নান করছে।
আর ঘুম এলো না। হঠাৎ মনে হল এও তো হতে পারে সুস্মিতা ভোর বেলাও তার প্রেমিকের কাছে গেছিল?
কিন্তু কে সুস্মিতার প্রেমিক তা আমার কাছে রহস্যই থেকে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আগের রাতের কথা মনে এলো- বন্ধ দরজার ওপারে কি আছে?

সারাদিন ধরে মনের মধ্যে খোঁচা দিচ্ছিল বুলু পিসির বাড়ীতে ওই বন্ধ দরজার ওপারে কি আছে? ওই বন্ধ দরজার সাথে কি সুস্মিতার অ্যাফেয়ারের কোনো সম্পর্ক আছে এমন কল্পনা আমি নিজের থেকেই তৈরী করে নিয়েছিলাম। এতদিন জানিও না ওই বুড়ি মহিলার ঘরে আর কেউ থাকে বলে। প্রথম থেকেই জানতাম তিনি একাই থাকেন। কখনো সুস্মিতাও বলেনি ওর সঙ্গে আর কেউ থাকে বলে। প্রতিবেশীরাও বুলুপিসি সম্পর্কে কম জানে। বুলু পিসি এই জমির যখন পাট্টা পায় তখন আর কেউ এ পাড়ায় বাড়ী করেনি।

অফিস থেকে ফেরবার সময় পাড়ার মধ্যে ঢুকতেই নারায়নের মুদির দোকান। ওর দোকানের সামনে আসতেই সিগারেটের কথা মাথায় এলো। সিগারেট শেষ হয়ে যাওয়ায় এক প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক নিলাম।

হঠাৎ মনে হল নারায়নকে জিজ্ঞেস করলে হয় না? নারায়নের দোকান এখানে অনেক দিন। ওর কাছে সব খবর মেলে।
একথা ওকথা করে জিজ্ঞেস করলাম…
নারায়নদা ওই আমার বাড়ীর পাশে বৃদ্ধাতো শয্যাশায়ী।

—কি বলেন সার, বুলুর কথা বলছেন?

—হ্যাঁ। ওর কি কেউ নেই?

—সার ওর এক ছেলে আছে। এখন কোথায় আছে বলতে পারব না।

—ও ওর ছেলে আছে। একবারও বুড়ি মাটাকে দেখতে আসে না?

—-হা হা হা। ওসমান? সার কি যে বলেন?

ওর ছেলে তো পাগল। আগে রশিদের মাংস দোকানে কাজ করত। মারামারি, কাটাকাটি এসব করতো। নেশার আড্ডায় একবার ভোজালি দিয়ে কুপিয়ে দিয়েছিল খলিল বলে একটা ছেলেকে। তারপর জেলও খেটেছে শালা। জেল থেকে বেরোনোর পর থেকেই পাগল। রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো, মেয়ে দেখলে গালি দিত। তারপর একদিন রাস্তায় মেয়ে বউদের দেখে হাত মারছিল। পুলিশ তুলে লিয়ে গিয়ে পাগলা গারদে দেয়। শালার তারপর থেকে খোঁজ নেই।
আমি পুরো চমকে যাই। একি বলেন নারায়নদা?
–আর কন কেন সার। বেচারা বুলু সুপারের কাজ করে যা আয় করতো তা ওই ওসমান নেশায় উড়িয়ে দিত। রসিদ ভাই না থাকলে বুলুর যে কি হত। তুমি পারলে রসিদ ভাইকে একবার খবর দিও।

আমি এতদিন এও জানতাম না বুলুপিসি মুসলমান বলে। হঠাৎ মাথায় এলো তবে বন্ধ দরজার পেছনে কি তবে পাগল ওসমান? আর সুস্মিতা কি ওই ভয়ানক পাগলের সাথে?
একজন ক্রিমিনাল এবং মানসিক রোগীর সাথে সুস্মিতা? না এটা হতে পারে না। এরকম বিপজ্জনক লোকের সাথে কেউ সম্পর্কতো দূরের কথা সামনেও পড়তে চায় না।

নারায়নের কথায় হুঁশ ফিরলো।
কি ভাবছেন সার?

—ওই ওসমান তো ভয়ংকর তবে?

—সার খুনী বাঞ্চোদটা। শালার দয়ামায়া কিছু নাই। তবে পাগল হবার পর ওসব আর দেখিনি। শুধু মাগি দেখলে ছুঁকছুঁক করত- ধন বার করে দেখাতো।

—ওর বয়স কত নারায়নদা?

—কত হবে। ধরুন আমার বয়সী।

—তবে তো বেশ বেশি?

—কি বলেন সার? আমার তো এখন মাত্র আটচল্লিশ।

—না মানে, আমি ভেবেছিলাম যুবক টুবক হবে।

সুস্মিতা একজন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই লোকের সঙ্গে কোনো যৌন সুখ পাবে না। আমি নিশ্চিত ওই পাগল শয়তানটা কখনোই সুস্মিতার প্রেমিক নয়।
কিন্তু সুস্মিতাতো ওই বিকট পুরুষালী ঘামের গন্ধ ওই বুড়ির বাড়ী থেকে নিয়েই এসেছিল? সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।

সুস্মিতাকে দেখছিলাম প্রতিদিনের মত রান্না ঘরে ব্যস্ত। অর্ঘ্য আজ বিরিয়ানি খেতে বায়না করেছে- সুস্মিতা ভালো বিরিয়ানি রাঁধে।
সুস্মিতার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনা। যেমন ও দায়িত্বশীল গৃহকত্রীর ভূমিকা নিত তেমনই রয়েছে।

কিন্তু ওসমানের ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একজন খুনী, মারাত্মক পাগলকে কখনো যৌনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা সুস্মিতা কেন কোনো নারীর পক্ষেই সম্ভব নয়।
নিশ্চই অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে।
ট্রাউজারের ভিতর সন্ধ্যে থেকেই উত্তাপ বাড়ছিল।
রাতে ঘুমোনোর সময় সুস্মিতা বলল- সমু আজ নয়, ভীষন টায়ার্ড লাগছে।
আমি আলতো করে হেসে সুস্মিতার ঠোঁটে চুমু দিলাম। আমার আচমকা চুমুতে সুস্মিতা হেসে ফেলল। বলল- কি ব্যাপার সমু, হঠাৎ রোমান্টিক হয়ে গেলে যে?

—সুস্মিতা ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বয়স হল। এখন আর কিছু না পারি রোমান্টিক হতে তো পারি। চুমুটুক আমার সুন্দরী বউকে খাবো না?

—আহা এমন কথা বলছো যেন আশি বছর পার করে দিলে? ক্ষমতা থাকলে লোকে ষাট বছরেও রোমান্টিক হতে পারে।

—তা তোমার কি কোনো ষাট বছরের প্রেমিক আছে নাকি?

সুস্মিতা বোধ হয় একটু হেঁয়ালি করতে চাইলো। কিন্তু আমি যে আগে থেকেই অনুমান করে বসে আছি তার জানা নেই।
বলল- প্রেমিক থাকলে রোমান্টিক হতে হবে, এমন কি আছে? আমার বর কি কম রোমান্টিক? বরং প্রেম করলে একজন র-কঠোর…
বলেই থেমে গেল সুস্মিতা।
আমি হেসে বললাম…
তাহলে তোমার বয়ফ্রেন্ড কি সেক্সী ‘র(rough) পুরুষ? আমিও কিন্তু র হয়ে যেতে পারি।

—তুমি চাইলেও পারবে না।

—কেন?

—তুমি আমায় ভালোবাসো।

—ভালোবাসলে কি র হওয়া যায় না?

সুস্মিতা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে ছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা গভীর নীরবতা অবস্থান করলো।
কিছুক্ষন পর আমিই বললাম- সুস্মিতা ধর আমার সাথে বিয়ে না হয়ে একজন রুক্ষ রগচটা পুরুষের সাথে তোমার বিয়ে হলে তুমি ঘর করতে পারতে?

—জানো সমু, ছোটবেলা থেকে ভাবতাম চাকরি-বাকরি করবো। বিয়ে-টিয়ে করবো না। তাই পড়াশোনায় সব সময় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। প্রাইমারী চাকরিটা পাবার পর তোমায় বাড়ী থেকে যখন প্রস্তাব আসে তখন প্রথম ভেবেছি বিয়ে করতে হবে। আমিও হঠাৎ করে রাজি হয়ে গেলাম। সত্যি কারে ভালোবাসা প্রথম তোমাকে পেয়েই বুঝলাম।

2 thoughts on “সর্ষের মধ্যে ভূত ২য় পর্ব”

Leave a comment